Breaking News

মাও সেতুং চিন্তাধারার বিরুদ্ধে গোঁড়া-সংশোধনবাদী আক্রমণকে প্রতিহত করো(এনভার হোজার Imperialism and the Revolution সম্পর্কে কিছু মন্তব্য)- J. Werner (দ্বিতীয় অধ্যায়)।

                      II. চীনে সমাজতন্ত্রের নির্মাণ

চীনে সমাজতন্ত্রের বিকাশ, কিংবা আদৌ তার বিকাশ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে হোজার বিশ্লেষণের পূর্ণাঙ্গ সমালোচনা করা বেশ কঠিন। কারণ, তাঁর বইয়ের এই অংশটিও নানা ধরনের খাপছাড়া যুক্তি, সস্তা কটাক্ষ এবং ইচ্ছাকৃত তথ্য বিকৃতিতে আরও বেশি করে পূর্ণ। তাঁর মূল বক্তব্যটা পড়লে এমন মনে হয় যে, “চীনা বিপ্লব আসলে একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হিসেবেই থেকে গিয়েছিল এবং তা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পরিণত হয়নি।”



হোজার যুক্তির মূল কথাই হলো, মাওয়ের নেতৃত্বে সর্বহারা শ্রেণি জাতীয় বুর্জোয়াদের সঙ্গে “ক্ষমতা ভাগ করে নিয়েছিল”। তিনি বলেছেন:

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে উত্তরণ তখনই সম্ভব, যখন সর্বহারা শ্রেণি দৃঢ়ভাবে বুর্জোয়াদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। যতদিন চীনের শ্রমিক শ্রেণি বুর্জোয়া শ্রেণির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিয়েছিল, যতদিন বুর্জোয়ারা তাদের বিশেষ সুবিধাগুলি ধরে রেখেছিল, ততদিন চীনে যে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা সর্বহারা শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা হতে পারে না। আর সেই কারণে, চীনা বিপ্লবও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পরিণত হতে পারেনি।

 ১৯৪৯ সালে পিপলস লিবারেশন আর্মি যখন কুওমিনতাঙকে পরাজিত করে সারা দেশে বিজয় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তখন গণতান্ত্রিক বিপ্লব মূলত এবং প্রধানত সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। মাও সঠিকভাবেই মনে করেছিলেন, জনগণের সেই সমস্ত অংশ, যারা সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করে এবং শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ ও শ্রমিক কৃষক জোটের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক ব্যবস্থা মেনে নিতে প্রস্তুত, তাদের নতুন রাষ্ট্রে অধিকার দেওয়া উচিত। চীনের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর অর্থ ছিল, বুর্জোয়া শ্রেণির সেই অংশগুলোকেও, বিশেষ করে মধ্য বা জাতীয় বুর্জোয়াদের, যারা এই শর্তগুলি পূরণ করত, সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। অন্তত সেই সময়ে, তারা এই একনায়কত্বের লক্ষ্যবস্তু ছিল না। চীনা বিপ্লবের চরিত্র, তার লক্ষ্য, তার চালিকাশক্তি এবং তার মিত্রদের সম্পর্কে মাওয়ের যে মৌলিক এবং সঠিক রাজনৈতিক লাইন ছিল, এই বিশ্লেষণ তার সঙ্গেই পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, যদিও এই মিত্রদের অবস্থান অনেক সময়ই ছিল দোদুল্যমান।

একই সময়ে, দেশজুড়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার আগেই, ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে মাও নতুন সরকার কীভাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাবে, তার মৌলিক নীতিও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। মাও পরিষ্কারভাবেই বলেছিলেন যে:

অস্ত্রধারী শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করার পরেও এমন শত্রু থেকে যাবে, যাদের হাতে অস্ত্র নেই। তারা আমাদের বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে লড়াই করবেই। তাই এই শত্রুদের কখনোই হালকাভাবে নেওয়া চলবে না...

শহরগুলিতে আমাদের সংগ্রামে আমরা কার ওপর নির্ভর করব? কিছু মাথামোটা কমরেড মনে করেন, আমাদের শ্রমিক শ্রেণির ওপর নয়, বরং গরিব জনসাধারণের ওপর নির্ভর করা উচিত। আরও মাথামোটা কিছু কমরেড মনে করেন, আমাদের বুর্জোয়াদের ওপর নির্ভর করা উচিত। … “আমাদের অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে শ্রমিক শ্রেণির ওপর নির্ভর করতে হবে, বাকি শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, বুদ্ধিজীবীদের নিজেদের পক্ষে আনতে হবে এবং যত বেশি সম্ভব জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির সেইসব অংশ ও তাদের প্রতিনিধিদের, যারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে, আমাদের পক্ষে নিয়ে আসতে হবে অথবা তাদের নিরপেক্ষ করতে হবে। যাতে আমরা সাম্রাজ্যবাদী, কুওমিনতাঙ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রাম চালাতে পারি এবং ধাপে ধাপে এই শত্রুদের পরাজিত করতে পারি।”

 বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এই কৌশলটি চীনের সুনির্দিষ্ট বাস্তব অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। সেই সময় চীনের জাতীয় অর্থনীতির মাত্র ১০ শতাংশ ছিল আধুনিক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, আর বাকি ৯০ শতাংশ জুড়ে ছিল কৃষি ও হস্তশিল্প। মাও দেখিয়েছিলেন, এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে জাতীয় বুর্জোয়াদের অংশগ্রহণ যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি রাষ্ট্রের মধ্যেও তাদের একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকা দরকার ছিল। কিন্তু মূল কথা হলো, আধুনিক শিল্পের অস্তিত্বই শ্রমিক শ্রেণিকে বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার এবং সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দিয়েছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন:

এর ফলে চীনে নতুন নতুন শ্রেণি ও রাজনৈতিক দল তৈরি হয়েছে—সর্বহারা শ্রেণি ও বুর্জোয়া শ্রেণি, এবং সর্বহারা ও বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক দল। সর্বহারা শ্রেণি এবং তার দল বহু ধরনের শত্রুর নিপীড়নের মধ্যে দিয়ে কঠিন সংগ্রামে নিজেদের গড়ে তুলেছে এবং চীনা জনগণের বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। যে কেউ এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করবে বা এর গুরুত্বকে খাটো করে দেখবে, সে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের ভুল করবে।

 তিনি আরও লিখলেন : 

চীনের আধুনিক শিল্পের উৎপাদনের মূল্য জাতীয় অর্থনীতির মোট উৎপাদন মূল্যের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ হলেও, এই শিল্প অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। এর মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের পুঁজি কেন্দ্রীভূত ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের দোসর চীনা আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতিদের হাতে। এই পুঁজি বাজেয়াপ্ত করে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণগুলি গণপ্রজাতন্ত্রের হাতে চলে আসে এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অর্থনীতি গোটা জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। অর্থনীতির এই অংশের চরিত্র পুঁজিবাদী নয়, সমাজতান্ত্রিক। যে কেউ এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করবে বা এর গুরুত্বকে খাটো করে দেখবে, সে দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের ভুল করবে।

সুতরাং বিপ্লবকে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মাওয়ের দৃষ্টিভঙ্গি হোজা যেভাবে ব্যঙ্গ করে একে নিছক “লোকদেখানো বুলি” বলে অভিহিত করেছেন, তা মোটেই তেমন কিছু ছিল না। এই দৃষ্টিভঙ্গি চীনের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল এবং অর্থনীতিকে কীভাবে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা যায়, সে সম্পর্কেও মাওয়ের একটি পরিষ্কার ধারণা ছিল। একই সঙ্গে মাও এটাও বুঝেছিলেন যে এই কাজ এক ধাক্কায় সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। অর্থনীতির বিশাল কৃষি ও হস্তশিল্প ক্ষেত্র তখনও রয়ে গিয়েছিল, যেখানে পুঁজিপতিদের কিছু ভূমিকা ছিল এবং তাদের অবিলম্বে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়াও সম্ভব ছিল না। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে:

এই সময়ে শহর ও গ্রামাঞ্চলের সেই সমস্ত পুঁজিবাদী উপাদানকে, যেগুলি জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয় বরং উপকারী, টিকে থাকতে এবং বিকশিত হতে দিতে হবে। এটা শুধু অনিবার্যই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রয়োজনীয়। তবে চীনে পুঁজিবাদের অস্তিত্ব ও বিকাশ পুঁজিবাদী দেশগুলির মতো লাগামহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন হবে না। বিভিন্ন দিক থেকে এর ওপর বিধিনিষেধ থাকবে—এর কাজের পরিধি, করনীতি, বাজারদর এবং শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের মাধ্যমে... ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজিবাদের ওপর এই নিয়ন্ত্রণের নীতি বুর্জোয়া শ্রেণির কাছ থেকে, বিশেষ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মালিকদের, অর্থাৎ বড় পুঁজিপতিদের কাছ থেকে নানা মাত্রায় ও নানা রূপে প্রতিরোধের মুখে পড়বেই। নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে [অর্থাৎ সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সময়] শ্রেণিসংগ্রামের প্রধান রূপ হবে নিয়ন্ত্রণ আর সেই নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতার মধ্যকার দ্বন্দ্ব।

 এই নীতিকেই হোজা বলছেন পুঁজিবাদের বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া!

পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শুরুর বছরগুলিতে মাওয়ের সমালোচনা করার সঙ্গে গৃহযুদ্ধের পর সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের শুরুর দিকে লেনিনের নেওয়া বিখ্যাত নয়া অর্থনৈতিক নীতির কীভাবে মিল হয়? হোজা সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর আগেই দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাই তিনি লেনিনের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন:

সর্বহারা রাষ্ট্রের জন্য বিপদ তখনই নেই, যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা শক্তভাবে সর্বহারা শ্রেণির হাতেই থাকে এবং পরিবহন ব্যবস্থা ও বড় শিল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণও তার হাতছাড়া না হয়।

তারপর হোজা নিজে লিখছেন:

আসলে ১৯৪৯ সালে কিংবা ১৯৫৬ সালে, মাও সে তুং যখন এই নীতিগুলোর কথা বলেছিলেন, তখন চীনে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বড় শিল্প কোনোটাই সর্বহারা শ্রেণির নিজের হাতে ছিল না।

তার ওপর, লেনিন নয়া অর্থনৈতিক নীতিকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই দেখেছিলেন। সেই সময়ের রাশিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও দেশের বাস্তব অবস্থার কারণেই এই নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। তিনি এটিকে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের কোনো সর্বজনীন নিয়ম হিসেবে দেখেননি। আর বাস্তব ঘটনা হলো, নয়া অর্থনৈতিক নীতি ঘোষণার মাত্র এক বছর পরেই লেনিন জোর দিয়ে বলেছিলেন যে পিছু হটার পর্ব শেষ হয়েছে এবং অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত পুঁজির বিরুদ্ধে আক্রমণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা বজায় রাখার এই পর্বটিকে প্রায় অনন্তকাল ধরে চলার মতো করেই ভাবা হয়েছিল। মাও সে তুংয়ের মতে, মুক্তির পর চীনে যে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা ছিল একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আর চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে এমনভাবে ক্ষমতায় থাকতে হতো যেন তারা ক্ষমতায় আছে বলে মনে হয়। এটাই হলো “মাও সে তুং চিন্তাধারা”।

 এটা হোজাবাদীদের চিরচেনা বিকৃতি আর মিথ্যার জগাখিচুড়ি! প্রথমত, ১৯৪৯ সালে মুক্তির পরপরই রাজনৈতিক ক্ষমতা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বড় শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সর্বহারা শ্রেণির হাতেই ছিল। রাষ্ট্রে সর্বহারা শ্রেণি এবং কমিউনিস্ট পার্টিই নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিল। আর বিশেষ করে পরিবহন ও বড় শিল্প সর্বহারা শ্রেণির হাতে ছিল না বলে যে দাবি হোজা করেছেন, তাতে মনে হয় তিনি ভাবেন, নিজের কল্পনায় কোনো কিছু বানিয়ে নিয়ে কাগজে লিখে দিলেই মানুষ তা কোনো প্রশ্ন না করে মেনে নেবে। তাঁর চারপাশে যে করুণ “আন্তর্জাতিক” সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা তিনি করছেন, তাদের ক্ষেত্রে হয়তো ব্যাপারটা এমন হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত মার্কসবাদী লেনিনবাদীরা এই কথা কখনোই মেনে নেবে না।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, হোজা লেনিনের কথার মধ্যে “রাশিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির কারণে নেওয়া সাময়িক ব্যবস্থা” এই অংশটাকেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ চীনের বাস্তব পরিস্থিতি ছিল গোটা বুর্জোয়া শ্রেণিকে সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত করার পক্ষে আরও অনেক কম অনুকূল। আমরা আগেই বলেছি, রাশিয়ার তুলনায় চীন অনেক বেশি পিছিয়ে ছিল। সেখানে মাত্র কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধ নয়, প্রায় তিন দশক ধরে চলা যুদ্ধ দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তার ওপর সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ চীনকে শোষণ করে, গলা টিপে ধরে, তার বিকাশকে দীর্ঘদিন ধরে রুদ্ধ করে রেখেছিল। এই বাস্তব পরিস্থিতিই মাওকে সেই নীতিগুলো গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল।

হোজার সেই দারুণ আবিষ্কার, যে লেনিন নয়া অর্থনৈতিক নীতিকে “সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের কোনো সর্বজনীন নিয়ম” হিসেবে দেখেননি, যেন মাও ঠিক তার উল্টোটা করেছিলেন, কিংবা তাঁর এই দাবি যে “মাওয়ের মতে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার কথা ছিল প্রায় অনন্তকাল”, এসব নিয়ে আমাদের আর বেশি কিছু বলার নেই। শুধু তাঁকে লেনিনের সেই কথাটাই মনে করিয়ে দিতে পারি, যা তিনি আরেক সমান দারুণ তর্কবাজ কাওৎসকির বিরুদ্ধে বলেছিলেন। কোনো প্রতিপক্ষের মুখে এমন একটি স্পষ্টতই বোকা কথা বসিয়ে দেওয়া, তারপর সেটাকেই খণ্ডন করা, এটা খুব একটা বুদ্ধিমান লোকের পদ্ধতি নয়। আর বলা যায়, খুব একটা মার্কসবাদী পদ্ধতিও নয়।

চীনা বিপ্লবের নয়া গণতান্ত্রিক পর্যায়ের তত্ত্ব নিয়ে নিচে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তবে এর মধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একেবারে শুরুর পর্যায়ে, যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, জমিদার এবং তাদের সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত বড় চীনা পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে অর্জিত বিজয়কে সুসংহত করাই ছিল প্রধান কাজ, তখনও মাও এমন সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন, যাতে চীনের ভবিষ্যৎ পুঁজিবাদী নয়, সমাজতান্ত্রিক হয়। তিনি নির্দিষ্ট কিছু সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন যে, অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সমাজতান্ত্রিক ক্ষেত্র। আর তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনা বিপ্লবকে কোন দিকে এগোতে হবে, তা স্পষ্ট করার জন্য মাও পার্টির ভেতরে তীব্র সংগ্রাম চালিয়েছিলেন এবং সামনে যে সংগ্রাম আসছে, তার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করেছিলেন।

১৯৫২ সালেই মাও “সমন্বিত অর্থনৈতিক ভিত্তি”র তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। এই লাইনটি লিউ শাওচি প্রচার করছিলেন। তাঁর মতে, চীনের অর্থনীতি সমাজতান্ত্রিক শিল্প, ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প এবং কৃষক অর্থনীতির একটি সুরেলা মিশ্রণ হিসেবে গড়ে উঠবে। মাও অবশ্য সঠিকভাবেই বলেছিলেন যে শহর ও গ্রামে পুঁজিবাদের সমস্ত উপাদানকে একসঙ্গে একবারে দূর করা সম্ভব নয় এবং এর কিছু বৈশিষ্ট্য তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকবে। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে একেবারে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে সমাজতান্ত্রিক সমাজে উত্তরণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আর নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে “সুদৃঢ়” করার চেষ্টা করার অর্থ হবে চীনকে পুঁজিবাদের পথে ঠেলে দেওয়া। তাত্ত্বিকভাবে, ১৯৫২ সালের জুন মাসে মাওয়ের এই বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়:

জমিদার শ্রেণি এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতি শ্রেণির পতনের পর চীনে শ্রমিক শ্রেণি ও জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্বই প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে উঠেছে। তাই জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণিকে আর মধ্যবর্তী শ্রেণি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত নয়।

 এভাবে মাও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একটি লক্ষ্যবস্তু। তাহলে কি এর মানে ছিল বুর্জোয়াদের সমস্ত সম্পত্তি সঙ্গে সঙ্গেই বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া যাবে কিংবা গোটা বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক অধিকার এক ধাক্কায় কেড়ে নেওয়া যাবে? না। চীনের অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতিতে তখনও বুর্জোয়া শ্রেণির কিছু অংশের অংশগ্রহণের প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণকে নিজেদের পক্ষে আনা জরুরি ছিল। বিশেষ করে গরিব ও নিম্নমধ্য কৃষকদের এগিয়ে এনে কৃষির সমবায়ীকরণ করা দরকার ছিল। পাশাপাশি, বুদ্ধিজীবীদেরও কাজে লাগানো এবং তাদের বড় অংশকে নিজেদের পক্ষে আনা প্রয়োজন ছিল, কারণ তাদের একটা বড় অংশই জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

আবারও দেখা যায়, হোজা যেভাবে মাওয়ের বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করেছেন, তার চেয়ে মাওয়ের নিজের কথাগুলোই পাঠকের জন্য অনেক বেশি উপযোগী: 

কিছু মানুষ মনে করেন, উত্তরণের সময়টা অনেক বেশি দীর্ঘ এবং তাই তারা অধৈর্য হয়ে পড়েন। এর ফলে “বাম” বিচ্যুতির ভুল হতে পারে। আবার কেউ কেউ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের পরও আগের জায়গাতেই রয়ে গেছেন। বিপ্লবের চরিত্র যে বদলে গেছে, তারা সেটা বুঝতে পারছেন না এবং সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের বদলে এখনও তাদের “নয়া গণতন্ত্র” নিয়েই এগিয়ে চলেছেন। এর ফলে “ডান” বিচ্যুতির ভুল হবে।

“নয়া গণতান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করো।” এই কথাটা ক্ষতিকর। উত্তরণের এই সময়ে সবসময়ই পরিবর্তন ঘটছে এবং প্রতিদিনই সমাজতন্ত্রের উপাদান গড়ে উঠছে। তাহলে এই “নয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা”কে কীভাবে “দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত” করা যায়? … উত্তরণের সময়টা দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামে ভরা। আমাদের বর্তমান বিপ্লবী সংগ্রাম অতীতের সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামের থেকেও গভীর। এই বিপ্লবের লক্ষ্য হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সমস্ত শোষণমূলক ব্যবস্থাকে চিরতরে কবর দেওয়া। “নয়া গণতান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করো” এই ধারণা আমাদের সংগ্রামের বাস্তবতার সঙ্গে যায় না এবং সমাজতান্ত্রিক কাজের অগ্রগতিতে বাধা দেয়।

“নয়া গণতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাও।” এটাও একটা অস্পষ্ট কথা। শুধু লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া, বছরের পর বছর এগিয়ে যাওয়া, এমনকি পনেরো বছর পরেও যদি শুধু সেই লক্ষ্যের দিকেই এগিয়ে যেতে হয়? শুধু এগিয়ে যাওয়ার কথা বলার মানেই হলো, এখনও লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়নি। কথাটা শুনতে ঠিকঠাক মনে হয়, কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এর ভিতটা তেমন শক্ত নয়।

১৯৫৩ সালে লেখা উপরের এই বক্তব্যটি আরও একবার প্রমাণ করে যে, মাওয়ের লাইন ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। একই সঙ্গে এটি আবার হোজা যেভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন, তাকে সরাসরি বিরোধিতা করে। ফলে দেখা যাচ্ছে, হোজার যে অভিযোগ “চীনের মুক্তির পর” মাও একটি “বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, সেটাও আবার সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। মাও মুক্তির পর চীনের নয়া গণতান্ত্রিক “ব্যবস্থাকে” সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে দেখেননি। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল সর্বহারা শ্রেণির শাসন, যা অন্যান্য প্রগতিশীল শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে পরিচালিত হয়েছিল। রাশিয়াতেও, কিছুটা ভিন্ন পরিস্থিতিতে, এমনটাই ঘটেছিল। বিশেষ করে কৃষকদের বিশাল জনসমষ্টির সঙ্গে এই জোট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়ে পরে আরও আলোচনা করা হবে। তাছাড়া, চীনা বিপ্লব সম্পর্কে যাদের সামান্যও ধারণা আছে, তারা ভালোভাবেই জানেন যে ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে মাও এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গোটা চীনে এক বিশাল সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার ফলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের কাজ মূলত সম্পন্ন হয়। 

এই অর্জনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গ্রামাঞ্চলে কৃষিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষক অর্থনীতি থেকে সমাজতান্ত্রিক মালিকানায় রূপান্তরিত করার বিশাল সংগ্রাম। মাও কৃষকদের নেতৃত্ব দিয়ে ভূমি সংস্কারের পর গৃহযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চলগুলিতে গড়ে ওঠা প্রাথমিক “পারস্পরিক সহযোগিতা দল”গুলোর গণ্ডি পেরিয়ে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৪৯ সালের বিজয়ের পর এই সহযোগিতা দলগুলো সারা চীনজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। “পারস্পরিক সহযোগিতা”র মধ্যে ভবিষ্যৎ সমাজতন্ত্রের কিছু উপাদান অবশ্যই ছিল, কিন্তু তা পুরনো সম্পত্তি সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলাতে পারেনি, কারণ জমির ব্যক্তিমালিকানা তখনও বহাল ছিল। মাও কৃষকদের আরও উচ্চস্তরের সমবায় গড়ে তুলতে এবং কৃষির প্রাথমিক সমবায়ীকরণ সম্পন্ন করতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সংগ্রাম করেন। এরপর দ্রুত গড়ে ওঠে বিশাল আকারের গণকমিউনগুলো। দীর্ঘ একটা সময় ধরে গ্রামাঞ্চলে এগুলোই সমাজতান্ত্রিক মালিকানার মূল রূপ হিসেবে থেকে যায়। পরে উৎপাদনশক্তির আরও বিকাশ এবং কৃষকদের সমাজতান্ত্রিক চেতনার আরও উন্নতির ফলে এমন একটি পরিবর্তন সম্ভব হওয়ার কথা ছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খামার গড়ে উঠবে এবং কৃষকেরা মজুরি শ্রমিকে পরিণত হবে।

এই বিশাল সংগ্রাম চালিয়ে যেতে মাওকে পার্টির ভেতরের দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হয়েছিল। তারা মনে করত, “সমবায়ীকরণের আগে যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে।” নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরত, যেখানে ত্রিশের দশকের শুরুর আগে কৃষির সমবায়ীকরণ হয়নি। মাও দেখিয়েছিলেন, চীনের দুর্বল শিল্পভিত্তি থেকে প্রয়োজনীয় ট্রাক্টর ও অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরি করে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করা সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত যদি সমবায়ীকরণ পিছিয়ে রাখা হয়, তাহলে বিপ্লবের জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। ভূমি সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর কৃষকদের মধ্যে দ্রুত বিভাজন তৈরি হতে থাকে। কেউ কেউ তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল হয়ে উঠছিল, আবার অন্যরা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছিল। মাও দেখিয়েছিলেন, এই পরিস্থিতিকে যদি কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই এগোতে দেওয়া হয়, তাহলে শ্রমিক কৃষক জোট ভেঙে পড়বে, যে জোট ছিল চীনা বিপ্লবের ভিত্তি, নয়া গণতান্ত্রিক পর্যায়ে যেমন, তেমনই সমাজতান্ত্রিক পর্যায়েও (যদিও সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ে তা আরও উন্নত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল)।

শহরগুলিতে যেসব কারখানা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চলত (যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি এগুলো কখনোই ছিল না), অথবা রাষ্ট্র ও ব্যক্তিমালিকানার যৌথ মালিকানায় চলত, সেগুলোকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। এটা ঠিক যে, অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানের আগের মালিকদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির ওপর নির্দিষ্ট হারে সুদ দেওয়া হতো, যা আসলে শ্রমিকদের শ্রমের এক ধরনের শোষণই ছিল। এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, চীনা বিপ্লবের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক পর্যায়ের বিশেষ পরিস্থিতির কারণে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির অনেকেই বিপ্লবের কিছু রূপান্তরমূলক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিল। বুর্জোয়া শ্রেণিকে একটি শ্রেণি হিসেবে উৎখাত ও বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে এগোলেও, মাও মনে করতেন বিপ্লবের স্বার্থে প্রত্যেক বুর্জোয়াকেই একেবারে শেষ পর্যন্ত লড়াই করা শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করার কিছু কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, কিছু কারখানা ইত্যাদি চালানোর জন্য তখনও বুর্জোয়াদের কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল। এই নীতি লেনিনের সেই সুপরিচিত নীতির থেকে খুব একটা আলাদা ছিল না, যেখানে পুরনো পুঁজিপতি শ্রেণির কিছু কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও ম্যানেজারকে সোভিয়েত রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করানোর জন্য “ঘুষ” দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এই নীতি ত্রিশের দশক পর্যন্তও চলেছিল এবং এটি ছিল একটি প্রয়োজনীয় আপস।

চীনে শিল্পের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন হওয়ার পরও বেশ কয়েক বছর ধরে এই সুদের টাকা দেওয়া হয়েছিল। হোজা এবং অন্যরা এই বিষয়টিকেই সামনে এনে দাবি করেন যে চীনে আদৌ কোনো প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেনি। কিন্তু এই দাবি আসলে বিষয়টাকে চরমভাবে বিকৃত করে দেখায়।

জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে থাকা উৎপাদনের উপায়গুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে নেওয়ার পর সেগুলোকে আর পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান বলা যায় না। কারখানাগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। উৎপাদনের মাত্রা এবং পরিকল্পনা নির্ধারিত হতো সমাজের সামগ্রিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে, যা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় ঠিক করা থাকত। বাজারের চাহিদা বা মুনাফা দেখানোর প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়। আগের মালিকরা তাদের পুরনো মালিকানা বিক্রি করতে বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারতেন না। আর আগের মালিকানার জন্য তারা যে সামান্য সুদের টাকা পেতেন, সেটাও পুঁজি হিসেবে আবার বিনিয়োগ করতে পারতেন না। একইভাবে, যেসব কারখানায় পুরনো মালিকদের কোনো না কোনো ভূমিকায় রেখে দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও কাজের পরিবেশ, কাজের নিয়মকানুন ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা আর তাদের হাতে ছিল না। শ্রমিকদের শ্রমের ফল ব্যক্তিগতভাবে কেউ আত্মসাৎ করতে পারত না। সংক্ষেপে, শিল্পক্ষেত্রে আর কোনো মৌলিক পুঁজিবাদী সম্পর্কই অবশিষ্ট ছিল না।

অবশ্যই পুঁজিপতিদের যে সুদ দেওয়া হতো, সেই টাকা আসত শ্রমিক শ্রেণির শ্রম থেকেই এবং সেই অর্থে এটাকে শোষণেরই একটি রূপ বলা যায়। একইভাবে, কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশ যখন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি থেকে মূলধনী পণ্য আমদানি করে এবং তার জন্য কোনো না কোনোভাবে সুদ দিতে হয়, তখন সেটাও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের একটি রূপ। কিন্তু একমাত্র গোঁড়া মতবাদী এবং যান্ত্রিক বস্তুবাদীই, যেমন হোজা করেছেন, এমন যুক্তি দিতে পারেন যে কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সে বড় হোক বা ছোট, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সঙ্গে কোনো ঋণচুক্তিতে যেতে পারবে না। এই অবস্থান লেনিনের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। পরিস্থিতি অনুকূল হলে লেনিন এ ধরনের বেশ কয়েকটি চুক্তিতে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। স্টালিনও তাই করেছিলেন। সবাই জানেন, তিনি পশ্চিমা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে, এমনকি ফোর্ড মোটর কোম্পানির কাছ থেকেও, একাধিক পুরো কারখানা আমদানি করেছিলেন। স্টালিনের এই নীতিকে অনুসরণ করার চেয়ে বরং সমালোচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। কিন্তু নিজের সুবিধামতো এখানে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও স্টালিনের প্রকৃত নীতিকে “চেপে গিয়ে”, আবার মাওয়ের বিরুদ্ধে স্টালিনকে সমর্থন করার ভান করা হোজার চূড়ান্ত ভণ্ডামি। তার ওপর, এখানে যে সাধারণ প্রশ্নটি নিয়ে কথা হচ্ছে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঋণচুক্তি বা এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নে হোজার বিপরীতে স্টালিনের অবস্থানই সঠিক।

এই বিষয়টি এখানে তোলার উদ্দেশ্য হলো একটা বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া: উৎপাদনের সমাজতান্ত্রিক সম্পর্ক দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পরও বাস্তবে পুঁজিবাদী সম্পর্কের কিছু অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে, এই ক্ষেত্রে যেমন সুদ দেওয়ার ব্যবস্থা। সমাজতন্ত্রের মধ্যেও পুঁজিবাদী উপাদান কীভাবে থেকে যেতে পারে, এই প্রশ্নটি মাও খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন এবং তা সমাধানের জন্য অনেক মনোযোগ দিয়েছিলেন, যা আমরা পরে দেখব। আর এই ক্ষেত্রেও তিনি শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে জোরালো শ্রেণিসংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন।

যেটা সবারই জানা থাকার কথা (যদিও হোজা মনে হয় সেটা “ভুলে গেছেন”), পুরনো মালিকদের সুদ দেওয়ার নীতি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। তা না হলে আজকের চীনা শাসকরা কেন “চারজনের” (আসলে মাওয়েরও) বিরুদ্ধে “জাতীয় বুর্জোয়াদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার” করার অভিযোগ তোলে? আর কেনই বা তারা তাদের সমস্ত সম্পত্তি এবং বকেয়া সুদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়? তার সঙ্গে চীনকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণের জন্য সত্যিকার অর্থেই এবং ব্যাপক আকারে দ্রুত খুলে দিচ্ছে!

স্বাভাবিকভাবেই, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রথম কয়েক বছরে অর্থনৈতিক ভিত্তিতে যে রূপান্তর ঘটানো হয়েছিল, তা উপরিকাঠামোর ক্ষেত্রে তীব্র সংগ্রাম ছাড়া সম্ভব ছিল না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলিতে, পার্টির মধ্যে, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এবং সামগ্রিকভাবে আদর্শের ক্ষেত্রেও এই সংগ্রাম চলেছিল। নতুন গড়ে ওঠা গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে “পুঁজিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, নাকি নিয়ন্ত্রণ করা হবে না”, এই দ্বন্দ্বই শ্রেণিসংগ্রামের প্রধান রূপ হবে বলে মাও যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বাস্তব ঘটনাপ্রবাহে সেটাই প্রমাণিত হয়। জনগণের শাসনের সঙ্গে শুরুতে যারা সহযোগিতা করেছিল, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যত গভীর হতে থাকে, সেই বুর্জোয়া শক্তিগুলোর অনেকেই ক্রমশ তার বিরোধিতা করতে শুরু করে।

এই সংগ্রামের একটা বড় অংশ ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করে। চীনের শ্রেণিসংগ্রামের ক্ষেত্রে এটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ। এই সময়েই মাও জনকমিউন গড়ে তোলার সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন এবং গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের অন্যান্য কর্মসূচিকেও সামনে আনেন। এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, নতুন সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর অর্থনীতিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ঠিক এই সময়েই সোভিয়েত সংশোধনবাদও বিজয়ী হয়ে সামনে আসে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকাশ ছিল সিপিএসইউর ২০তম পার্টি কংগ্রেসে ক্রুশ্চেভের তথাকথিত “গোপন ভাষণ”। ভাষণটি আসলে মোটেই “গোপন” ছিল না। বরং এটি ছিল সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে থাকা সংশোধনবাদীদের জন্য এক ধরনের সংকেত, যাতে তারা প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসে সংশোধনবাদী লাইন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম শুরু করতে পারে। চীনও এর ব্যতিক্রম ছিল না। একই সময়ে পূর্ব ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডে, প্রতিবিপ্লবীরা “একনায়কত্বের” বিরোধিতা এবং (বুর্জোয়া) গণতন্ত্রের দাবির নামে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতির প্রভাব চীনেও পড়েছিল, বিশেষ করে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে।

এই পরিস্থিতির পটভূমিতেই মাও “শত ফুল” আন্দোলনের সূচনা করেন, যার স্লোগান ছিল, “শত ফুল বিকশিত হোক, শত চিন্তার প্রতিযোগিতা হোক।” এই আন্দোলন নিয়ে কোনো প্রকৃত বিশ্লেষণ না করেই হোজা এই স্লোগানটাকেই ধরে এমনভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যেন মাওয়ের বক্তব্য ছিল, “সর্বহারা মতাদর্শ, বস্তুবাদ ও নাস্তিকতার পাশাপাশি বুর্জোয়া মতাদর্শ, ভাববাদ ও ধর্মের অস্তিত্বও মেনে নিতে হবে; ‘সুগন্ধি ফুলের’ পাশাপাশি ‘বিষাক্ত আগাছা’ও বেড়ে উঠতে দিতে হবে,” ইত্যাদি। কিন্তু এই সময়ে মাওয়ের লেখা সত্যিই খুঁটিয়ে পড়লে পরিষ্কার বোঝা যায়, “শত ফুল” আন্দোলনের উদ্দেশ্য আসলে হোজা যেভাবে দেখিয়েছেন, তার ঠিক উল্টো ছিল।

মাও বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন যে চীনা সমাজে তখনও পরস্পর বিরোধী শ্রেণি হিসেবে বুর্জোয়া ও সর্বহারা শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল এবং এই দুই শ্রেণির মধ্যে শ্রেণিসংগ্রাম কোনো নির্দেশ জারি করলেই হঠাৎ শেষ হয়ে যাবে না বা বিলুপ্ত হবে না। তিনি আরও দেখিয়েছিলেন যে জনগণের মধ্যেও, যার মধ্যে শ্রমিক ও কৃষকরাও রয়েছে, নানা ধরনের দ্বন্দ্ব ছিল এবং সেগুলোকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করা না হলে তারাও বৈরীমূলক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়ে বিপ্লবের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই মাও একই সময়ে দুই ধরনের দ্বন্দ্ব, অর্থাৎ বৈরীমূলক ও অবৈরীমূলক দ্বন্দ্বকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেই কঠিন বাস্তব সমস্যার সঙ্গে কাজ করছিলেন। এই দুই ধরনের দ্বন্দ্ব একে অপরের থেকে পুরোপুরি আলাদা ছিল না। বরং তারা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল এবং এক ধরনের দ্বন্দ্ব অন্য ধরনের দ্বন্দ্বে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকম ছিল। একদিকে, তাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জনগণের সরকারকে সমর্থন করত, অন্যদিকে তারা তখনও নিজেদের পুরোপুরি বদলে নিতে পারেনি এবং বুর্জোয়া মতাদর্শ ধরে রেখেছিল। তাই মূলত এটি ছিল একটি অবৈরীমূলক দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ, এর সমাধান করতে হতো আলোচনা ও সংগ্রামের মাধ্যমে, জোরজবরদস্তি করে বা তাদের অধিকার কেড়ে নিয়ে নয়। একই সঙ্গে এটাও বেশ স্পষ্ট ছিল যে, এই অপরিবর্তিত বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে থাকা দ্বন্দ্বটি প্রতিবিপ্লবীদের সঙ্গে থাকা বৈরীমূলক দ্বন্দ্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। পার্টির বাইরে ও ভেতরে থাকা প্রধান দক্ষিণপন্থীরা যেসব বিষয় বারবার সামনে আনছিল, তার অনেকগুলোর লক্ষ্যই ছিল এই বুদ্ধিজীবীদের এমন একটি সামাজিক ভিত্তির অংশ হিসেবে সংগঠিত করা, যার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানো যায়।

এই বিষয় নিয়ে মাওয়ের চিন্তাভাবনার ওপর সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপেরও প্রভাব ছিল। এর মধ্যে শুধু ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের উত্থানই ছিল না, স্টালিনের করা ভুলগুলোর বিশ্লেষণও ছিল। বিশেষ করে ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি ও শেষের দিকে, যখন শিল্প ও কৃষির মৌলিক সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, তখন স্টালিন ঘোষণা করেছিলেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নে আর কোনো বৈরীমূলক শ্রেণি নেই এবং ভবিষ্যতে এমন শ্রেণির উদ্ভবের সম্ভাবনাও তিনি দেখেননি। সমাজতন্ত্রের অধীনে শ্রেণিসংগ্রামের মৌলিক প্রশ্নটি একটু পরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। কিন্তু বিপ্লবের এই প্রাথমিক পর্যায়েও, যখন কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই একটি নতুন বুর্জোয়া শ্রেণি গড়ে ওঠার প্রশ্নটি চীনা বিপ্লবের সামনে প্রধান সমস্যা হয়ে ওঠেনি, স্টালিনের এই ভুলগুলোর সমালোচনা মাওয়ের চিন্তার গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। মাও বুঝেছিলেন যে বৈরীমূলক ও অবৈরীমূলক এই দুই ধরনের দ্বন্দ্বের পার্থক্য না বোঝা এবং দুটিকে গুলিয়ে ফেলার ফল হবে দুটি। প্রথমত, এর ফলে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা হবে এবং যারা তা করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দৃঢ় সর্বহারা একনায়কত্ব প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা হবে। দ্বিতীয়ত, জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে যে আলাদা পদ্ধতিতে, অর্থাৎ আলোচনা ও সংগ্রামের মাধ্যমে, মোকাবিলা করতে হয়, সেটাও বোঝা যাবে না। আর তা না হলে অবৈরীমূলক দ্বন্দ্বগুলো বৈরীমূলক দ্বন্দ্বে পরিণত হবে এবং এর ফলে জনগণের বড় বড় অংশকে প্রতিবিপ্লবীরা নিজেদের পক্ষে টেনে নিয়ে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত করার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। এই সমস্যাটিই, “উদারতাবাদ” নয়, মাওয়ের “শত চিন্তার প্রতিযোগিতা হোক” নীতির মূল কথা ছিল।

নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেও শ্রেণিসংগ্রাম চলতে থাকবে, এই উপলব্ধি থেকেই এবং আগে উল্লেখ করা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মিলনে যে বড় ধরনের সংগ্রাম সামনে আসছে, তা বুঝেই মাও আহ্বান জানালেন, “শত ফুল বিকশিত হোক, শত চিন্তার প্রতিযোগিতা হোক।” মানুষকে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে, পার্টির কী কী ত্রুটি রয়েছে বলে তারা মনে করে তা বলতে এবং সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলাখুলি বিতর্ক করতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। একই সময়ে মাও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে প্রতিবিপ্লবীদের, আর এখানে তিনি বিশেষভাবে সেইসব শক্তির কথা বলছিলেন, যাদের পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে প্রতিবিপ্লব দমনের আন্দোলনগুলোর মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছিল, এই ধরনের বাকস্বাধীনতা দেওয়া যাবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “সুগন্ধি ফুল” আর “বিষাক্ত আগাছা”র মধ্যে পার্থক্য করতে জনগণকে সাহায্য করার জন্য তিনি কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশিকাও তৈরি করেছিলেন:

আক্ষরিক অর্থে দেখলে, “শত ফুল বিকশিত হোক” এবং “শত চিন্তার প্রতিযোগিতা হোক” এই দুটি স্লোগানের নিজেদের মধ্যে কোনো শ্রেণিগত চরিত্র নেই। সর্বহারা শ্রেণি যেমন এগুলোকে কাজে লাগাতে পারে, তেমনই বুর্জোয়া শ্রেণি বা অন্যরাও পারে। কোনটা “সুগন্ধি ফুল” আর কোনটা “বিষাক্ত আগাছা”, তা নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি, স্তর ও সামাজিক গোষ্ঠীর নিজস্ব মত রয়েছে। তাহলে আজ জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে “সুগন্ধি ফুল” আর “বিষাক্ত আগাছা”র মধ্যে পার্থক্য করার মাপকাঠি কী হওয়া উচিত? রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির কথা ও কাজ সঠিক না ভুল, তা আমাদের জনগণ কীভাবে বিচার করবে? ... মাপকাঠিগুলো হওয়া উচিত নিম্নরূপ: 

(১) আমাদের কথা ও কাজ দেশের সমস্ত জাতীয়তার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করা উচিত, বিভক্ত করা নয়।

(২) সেগুলো সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর ও সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের পক্ষে উপকারী হওয়া উচিত, ক্ষতিকর নয়।

(৩) সেগুলো জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বকে সুদৃঢ় করতে সাহায্য করা উচিত, তাকে দুর্বল বা ক্ষুণ্ণ করা নয়।

(৪) সেগুলো গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণকে সুদৃঢ় করতে সাহায্য করা উচিত, তাকে দুর্বল বা ক্ষুণ্ণ করা নয়।

(৫) সেগুলো কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করা উচিত, সেই নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বা তাকে দুর্বল করা নয়।

(৬) সেগুলো আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক ঐক্য এবং বিশ্বের শান্তিকামী জনগণের ঐক্যের পক্ষে উপকারী হওয়া উচিত, ক্ষতিকর নয়। 

এই ছয়টি মাপকাঠির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমাজতান্ত্রিক পথ এবং পার্টির নেতৃত্ব সম্পর্কিত দুটি মাপকাঠি।

 

মাওয়ের মনে এমন কোনো ভুল ধারণা ছিল না যে সামনে যেরকম সংগ্রাম আসছে, সেখানে বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীরা এই মাপকাঠিগুলো মেনে চলবে। তিনি বরং জানতেন যে আসলে ঘটতে চলেছে ঠিক তার উল্টোটা। হাঙ্গেরিতে তাদের সমমনা লোকেরা যেমন করেছিল তেমনি তারাও পার্টির নেতৃত্ব এবং সমাজতান্ত্রিক পথের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালাবে। পার্টি তাদের “অনুমতি” দিক বা না দিক, তারা যে প্রকাশ্যে এসে পুঁজিবাদ ফিরিয়ে আনার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করবে, মাও কিন্ত তা ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। তাই এই ছয়টি মাপকাঠি সামনে রেখে, বিশেষ করে দুটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে, মাও আসলে জনগণকে একটা পরিষ্কার ভিত্তি দিতে চেয়েছিলেন, যাতে সামনে উঠে আসা নানা মতামত ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল, তা তারা নিজেরাই বুঝে নিতে পারে।

১৯৫৭ সালের বসন্তে “শত ফুল” অভিযানের শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পার্টির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু হয়। এই আক্রমণের নেতৃত্বে ছিল ডেমোক্রেটিক লীগ, যেটা ছিল একটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল, যারা গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সরকারে অংশ নিয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল ওয়েন হুই পাও পত্রিকা, যেটি ডেমোক্রেটিক লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল এবং জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরত। এর পাশাপাশি পার্টির কিছু সদস্যও এই উন্মত্ত আক্রমণে যোগ দিয়েছিল। দক্ষিণপন্থীরা পশ্চিমা ধাঁচের “গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে এবং বলে, “কমিউনিস্ট পার্টিকে পালকি থেকে নামতে হবে।” দক্ষিণপন্থীদের বিভিন্ন ঘাঁটিতে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, একই ধরনের বক্তব্য নিয়ে পোস্টার লাগানো হতে থাকে। এমনকি পার্টির সমর্থনে লেখা পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, মানুষকে মারধর করা ইত্যাদি নানা কদর্য ঘটনাও ঘটতে থাকে।

এই নিয়ে মাওয়ের নীতি ছিল কিছুদিন চুপচাপ অপেক্ষা করা, যাতে করে বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীরা নিজেরাই সামনে বেরিয়ে এসে নিজেদের আসল চেহারা প্রকাশ করে এবং একই ধরনের চিন্তা ও কর্মসূচি থাকা পার্টির সদস্যরাও তাড়াহুড়ো করে তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে। কিন্তু বুর্জোয়া লাইন আর মার্কসবাদ লেনিনবাদের মধ্যে কোনো ধরনের শান্তিপূর্ণ “সহাবস্থান” বজায় রাখার প্রশ্নই মাওয়ের কাছে ছিল না। বরং তিনি জনগণের বিশাল অংশকে সঙ্গে নিয়ে বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে তীব্র পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। পার্টি ও জনগণের আঘাতে বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীরা শেষ পর্যন্ত দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় জনগণের মধ্যে পার্টির নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম এবং চীনের দক্ষিণপন্থীরা তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে মাওয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে তিনি নাকি তাদের “ফাঁদে ফেলেছেন”। অর্থাৎ, তাদের প্রতিক্রিয়াশীল কর্মসূচি প্রকাশ্যে আনার সুযোগ দিয়ে পরে সেটার ওপরই আঘাত করেছেন। মাও এর জবাবে বলেছিলেন:

 জনগণ এর ফলে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিল, কারা সত্যিই ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা করছে আর কারা মিথ্যা সমালোচনার আড়ালে আসলে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সময় যখন উপযুক্ত হলো, তখন তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিও সংগঠিত করা গেল। কেউ কেউ বলেন, এটা ছিল একটা গোপন পরিকল্পনা। আমরা বলি, পরিকল্পনাটা মোটেই গোপন ছিল না। কারণ আমরা আগেই শত্রুদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলাম, ভূত আর দানবকে প্রকাশ্যে আসতে না দিলে তাদের ধ্বংস করা যায় না; বিষাক্ত আগাছাকে মাটি থেকে বেরিয়ে আসতে না দিলে তাকে উপড়ে ফেলা যায় না। কৃষকরা কি বছরে কয়েকবার আগাছা পরিষ্কার করেন না? তার ওপর, উপড়ে ফেলা আগাছা সার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। শ্রেণিশত্রুরা সবসময় নিজেদের সামনে আনার সুযোগ খুঁজবে। রাষ্ট্রক্ষমতা হারিয়ে এবং নিজেদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হতে দেখে তারা কখনোই চুপচাপ মেনে নেবে না। কমিউনিস্ট পার্টি তাদের আগেই যতই সতর্ক করুক বা নিজেদের মৌলিক কৌশল সম্পর্কে তাদের যতই জানিয়ে রাখুক, তারা তবুও আক্রমণ চালাবেই। শ্রেণিসংগ্রাম মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়, এটি একটি বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা। অর্থাৎ, শ্রেণিসংগ্রাম অনিবার্য। মানুষ চাইলেও তা এড়িয়ে যেতে পারে না। আমাদের একমাত্র কাজ হলো এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সংগ্রামকে বিজয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। 

 

 সংগ্রামকে বিজয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বলতে মাও ঠিক সেটাই করেছিলেন “শত ফুল” অভিযানের সময়। জনগণ জেগে উঠেছিল এবং বিপ্লবের অর্জন ও চলমান সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের ওপর এই উন্মত্ত আক্রমণ তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীরা পিছু হটেছিল, কিন্তু মাও তাদের পিছু ধাওয়া করেছিলেন এবং কয়েকটা ভদ্র গোছের আত্মসমালোচনার কথা বলে তারা যেন নিজেদের বিপদ থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করেছিলেন। যারা প্রতিবিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, (বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীদের হাতে মারধর, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটেছিল), তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। হোজা মাওকে এমন একজন উদারপন্থী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, যিনি নাকি তার আশেপাশে প্রতিবিপ্লবীদের রাখতেই পছন্দ করতেন। কিন্তু বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চলাকালীন মাও খুব স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন:

যেখানেই প্রতিবিপ্লবীদের পাওয়া যাবে, তাদের নির্মূল করতে হবে। খুব অল্প সংখ্যককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান তুলে দেওয়া যাবে না বা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা যাবে না। ... জনগণ যাদের খারাপ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে, তাদের শাস্তি দিতে হবে। বর্তমানে বিচারবিভাগ ও জননিরাপত্তা দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছেন না এবং যাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়া উচিত, তাদের বাইরে ঘুরে বেড়াতে দিচ্ছেন। এটা ভুল। অতিরিক্ত শাস্তি দেওয়া যেমন ভুল, তেমনই প্রাপ্য শাস্তি না দেওয়াও ভুল। আর এই মুহূর্তে বিপদটা দ্বিতীয় ক্ষেত্রেই বেশি।

 এছাড়াও, পার্টির বাইরে ও ভেতরে যেসব বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাদের রাজনৈতিক অধিকার কঠোরভাবে সীমিত করা হয়। আসলে মাওয়ের মৃত্যুর পরেই এই প্রতিক্রিয়াশীলদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সংশোধনবাদী অভ্যুত্থানের পর হুয়া কুও ফেং ও তেং সিয়াও পিংই সেই অধিকার ফিরিয়ে দেন।

“শত ফুল” অভিযান ১৯৫৮ সাল জুড়েই চলেছিল। তবে ১৯৫৭ সালের গ্রীষ্মের পর বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থীরা আর আক্রমণের অবস্থানে ছিল না। এরপর দেওয়াল পোস্টার ও সংবাদপত্রের লেখালেখি মূলত সাধারণ জনগণের, বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষকদের হাতেই চলে আসে। কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচনা তখনও হচ্ছিল, কিন্তু তার চরিত্র ছিল একেবারেই আলাদা। সেই সমালোচনা মাওয়ের নির্ধারিত ছয়টি মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করে, শুধু কথায় নয়, বাস্তব কাজেও প্রকাশ পাচ্ছিল। এসব সমালোচনা কমিউনিস্ট পার্টিকে আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিল। আর জনগণের মধ্যে এত ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের ফলে পার্টির লাইন এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চরিত্র সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়া আরও গভীর হয়েছিল। একই সঙ্গে এই বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের দৃঢ়তা ও সক্ষমতাও বেড়ে গিয়েছিল।


মাও যেমন পরে উল্লেখ করেছিলেন, “শত ফুল” অভিযান শুধু জনগণের জন্যই নয়, পার্টির জন্যও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার ক্ষেত্র। মাও বলেছিলেন: 

মার্কসবাদীদের কোনো দিক থেকেই আসা সমালোচনাকে ভয় পাওয়া উচিত নয়। বরং তার ঠিক উল্টোটা। সমালোচনার মুখে এবং সংগ্রামের ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়েই তাদের নিজেদের আরও শক্ত করে গড়ে তুলতে হবে, নিজেদের বিকশিত করতে হবে এবং সমালোচনার মধ্য দিয়েই নতুন অবস্থান অর্জন করতে হবে। ভুল চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা অনেকটা টিকা নেওয়ার মতো। টিকা নিলে যেমন মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, তেমনই ভুল চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ফলে মার্কসবাদীদের প্রতিরোধক্ষমতাও বাড়ে। গ্রিনহাউসে বড় করা গাছপালা সাধারণত খুব শক্তপোক্ত হয় না। “শত ফুল বিকশিত হোক, শত চিন্তার প্রতিযোগিতা হোক” এই নীতি বাস্তবায়ন করলে মতাদর্শের ক্ষেত্রে মার্কসবাদের নেতৃত্ব দুর্বল হবে না, বরং আরও শক্তিশালী হবে।

অমার্কসবাদী চিন্তার প্রতি আমাদের নীতি কী হওয়া উচিত? যারা স্পষ্টভাবেই প্রতিবিপ্লবী এবং সমাজতান্ত্রিক কাজকে নষ্ট করার চেষ্টা করে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা সহজ। তাদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেব। কিন্তু জনগণের মধ্যে থাকা ভুল চিন্তার ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। এই ধরনের চিন্তা কি নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত এবং সেগুলো প্রকাশ করার কোনো সুযোগই দেওয়া উচিত নয়? অবশ্যই নয়। জনগণের মধ্যে মতাদর্শগত প্রশ্ন, অর্থাৎ মানুষের চিন্তার জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে গিয়ে মোটা দাগের বা জোরজবরদস্তির পদ্ধতি ব্যবহার করা শুধু ব্যর্থই হবে না, বরং ভীষণ ক্ষতিকরও হবে।

ভুল চিন্তার প্রকাশ আপনি নিষিদ্ধ করতে পারেন, কিন্তু চিন্তাটা তো তাতে মুছে যাবে না। অন্যদিকে, সঠিক চিন্তাকে যদি গ্রিনহাউসে যত্ন করে রেখে দেওয়া হয়, বাইরের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে না দেওয়া হয় এবং ভুল চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের শক্ত করে তোলার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে সেগুলোও ভুল চিন্তার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জিততে পারবে না। তাই আলোচনা, সমালোচনা ও যুক্তির পথেই কেবল আমরা সঠিক চিন্তাকে সত্যিকারের বিকশিত করতে পারি, ভুল চিন্তাকে কাটিয়ে উঠতে পারি এবং সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান করতে পারি।

এখন আমরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পারি, “শত ফুল” অভিযানের দুটি দিক কী ছিল, যেটাকে হোজা এবং অন্যান্য গোঁড়া সংশোধনবাদীরা এতটা বিদ্বেষ আর মিথ্যাচারের সঙ্গে আক্রমণ করেছে। (সেই সময়ের ক্রুশ্চেভপন্থী সংশোধনবাদীরাও একইভাবে এটাকে “উদারতাবাদ” বলে বদনাম করেছিল।) প্রথমত, চীনে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর এবং বুর্জোয়া শ্রেণির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ফলে যে প্রতিবিপ্লবী প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল, তার মোকাবিলা করা এবং তাকে পিছনে ঠেলে দেওয়াই ছিল এর একটি উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে, সংশোধনবাদের উত্থান এবং হাঙ্গেরিতে প্রতিবিপ্লবী বিদ্রোহও এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। দ্বিতীয়ত, “শত ফুল” ছিল মতাদর্শের ক্ষেত্রে দেশজুড়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের আহ্বান। এই বিতর্কের ফলে চীনের সর্বহারা শ্রেণি ও জনগণের মধ্যে মার্কসবাদ লেনিনবাদের প্রভাব আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। 

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, গোঁড়া সংশোধনবাদীরা “শত ফুল” অভিযান নিয়ে এত হইচই করে কেন? এর সবচেয়ে সহজ উত্তর অবশ্যই হলো, হোজা ও তার সঙ্গীদের জন্য এটা দারুণ একটা সুযোগ। এর সাহায্যে তারা প্রসঙ্গ থেকে উদ্ধৃতি টেনে বের করতে পারে, বাস্তব ঘটনাকে উল্টে দিতে পারে এবং এমন একটা ছবি তৈরি করতে পারে যেন মাও আর পাঁচজন উদারপন্থী নেতার মতোই ছিলেন। কিন্তু এর বাইরেও একটা গভীর কারণ আছে। “শত ফুল” অভিযান হোজাকে এতটা ক্ষিপ্ত করে, কারণ এর পেছনে থাকা রাজনৈতিক বোঝাপড়াই সমাজতন্ত্র কীভাবে বিকশিত হয়, সে সম্পর্কে তার পুরো যান্ত্রিক ও ভ্রান্ত ধারণার গোড়ায় আঘাত করে। বর্তমানে আলবেনীয় পার্টিতে যে ধারণাটি প্রাধান্য পেয়েছে, তা হলো জনগণ মার্কসবাদকে গ্রহণ করবে এবং বুর্জোয়া মতাদর্শকে ছুড়ে ফেলবে পার্টি একটানা জনগণকে শিক্ষিত করে যাওয়ার একটি “অবিচ্ছিন্ন” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ, দুই লাইনের এবং দুই পথের মধ্যে তীব্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নয়, বিতর্ক ও সংগ্রামের ব্যাপক স্রোতকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে নয়। আর আমরা পরে দেখব, এই ধারণাই হোজাকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে তার প্রতিবিপ্লবী মূল্যায়নের দিকে নিয়ে যায়।

হোজার সামগ্রিক রাজনৈতিক লাইন এবং আলবেনীয় পার্টির কার্যকলাপের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ এই লেখার পরিধির বাইরে। তবে “শত ফুল” অভিযানে মাওয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সমাজতন্ত্রের অধীনে শ্রেণিসংগ্রাম সম্পর্কে আলবেনীয় পার্টির অবস্থানের তুলনা করা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৭৬ সালের শেষদিকে গৃহীত আলবেনিয়ার নতুন সংবিধানে বলা হয়েছে:

আলবেনিয়ার সমাজতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রে কোনো শোষক শ্রেণি নেই, ব্যক্তিগত মালিকানা এবং মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণ বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং তা নিষিদ্ধ।

 কিন্তু আলবেনিয়ার আইনি নথিতে যা-ই লেখা থাকুক, আর মিস্টার হোজা যতই তা নিষিদ্ধ করুন না কেন, আলবেনিয়াতেও বৈরীমূলক শ্রেণি এখনও বিদ্যমান, যেমন চীনে ছিল এবং আছে। সংবিধানের এই বক্তব্য আসলে আইনি বিধান আর সামাজিক বাস্তবতাকে এক করে ফেলার ভুল। ইতিহাসের বর্তমান পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, এই অবস্থান মার্কসবাদেরই সচেতন প্রত্যাখ্যানকে প্রকাশ করে।

কারণ হোজা বুর্জোয়া শ্রেণির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পর সমাজতন্ত্রের মধ্যেও বৈরীমূলক শ্রেণির অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না (এ বিষয়ে পরে আরও আলোচনা হবে), তাই সমাজতান্ত্রিক সমাজের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্বকে কীভাবে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে হয়, সেটাও তিনি বুঝতে পারেন না। ফলে তিনি অনিবার্যভাবে একের পর এক “বাম” ও দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতির মধ্যে পড়ে যান। এর অন্যতম ফল হলো, জনগণের মধ্যকার অবৈরীমূলক দ্বন্দ্বগুলো বৈরীমূলক দ্বন্দ্বে পরিণত হয় এবং সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

হোজার “শত ফুল” অভিযান এবং জাতীয় বুর্জোয়াদের প্রতি মাওয়ের কথিত “উদারতাবাদ” নিয়ে সমালোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে আরেকটি বিষয়। সেটা হলো, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি কিছু বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলকে অস্তিত্ব বজায় রাখার সুযোগ দিয়েছিল এবং এমনকি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন সংস্থায় তাদের কিছুটা ভূমিকা রাখার সুযোগও দিয়েছিল। হোজা মাওয়ের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন: “শেষ পর্যন্ত কোনটা ভালো, শুধু একটি পার্টি থাকা, নাকি একাধিক পার্টি থাকা? এখন আমরা যেভাবে দেখছি, তাতে হয়তো একাধিক পার্টি থাকাই ভালো। অতীতেও এটা সত্য ছিল এবং ভবিষ্যতেও এমনটাই হতে পারে; এর অর্থ হলো দীর্ঘমেয়াদি সহাবস্থান ও পারস্পরিক তদারকি।” (ইংরেজি অনুবাদে তির্যক অক্ষরে থাকা শব্দগুলো মাওয়ের মূল বক্তব্যে ছিল না।)

এরপর হোজা মন্তব্য করেন:

মাও বুর্জোয়া দলগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণ এবং দেশ পরিচালনায় তাদের এমন অধিকার ও ক্ষমতা থাকা জরুরি বলে মনে করতেন, যা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সমান। শুধু তাই নয়, তাঁর মতে, এই বুর্জোয়া দলগুলো, যেগুলো ‘ঐতিহাসিক’, কেবল তখনই বিলুপ্ত হবে যখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টিও বিলুপ্ত হবে। অর্থাৎ, তারা কমিউনিজম পর্যন্ত পাশাপাশি সহাবস্থান করবে।

 আবারও মাওয়ের নিজের কথাই শোনা সবচেয়ে উপযোগী। আর এবারও সেই একই অংশ থেকে, যেখান থেকে হোজা তাঁর “উদ্ধৃতি” দিয়েছেন:

কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণতান্ত্রিক দলগুলো ইতিহাসেরই সৃষ্টি। ইতিহাসে যা জন্ম নেয়, একদিন ইতিহাসেই তার অবসান ঘটে। তাই একদিন কমিউনিস্ট পার্টিরও অবসান হবে, গণতান্ত্রিক দলগুলোরও হবে। এই বিলুপ্তি কি কোনো দুঃখের বিষয়? আমার মতে, বরং এটাই হবে আনন্দের বিষয়। একদিন আমরা কমিউনিস্ট পার্টি এবং সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বেরও অবসান ঘটাতে পারব, সেটাই ভালো। আমাদের কাজ হলো সেই বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করা। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা বহুবার কথা বলেছি।

কিন্তু বর্তমানে সর্বহারা পার্টি এবং সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব ছাড়া আমাদের চলবে না। বরং এগুলোকে আরও শক্তিশালী করাই এখন জরুরি। তা না হলে আমরা প্রতিবিপ্লবীদের দমন করতে, সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতিরোধ করতে, সমাজতন্ত্র গড়ে তুলতে কিংবা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তাকে সুসংহত করতে পারব না। কিছু মানুষ যেমন দাবি করে, সর্বহারা পার্টি এবং সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব নিয়ে লেনিনের তত্ত্ব কোনোভাবেই “সেকেলে” হয়ে যায়নি।

এখানেই পরিষ্কার হয়ে যায়, মাও আসলে যা বলেছেন, হোজা তাঁর মুখে যে কথা বসানোর চেষ্টা করেছেন, তার সঙ্গে তার খুব সামান্যই মিল আছে। হোজা যখন বলেন যে গণতান্ত্রিক দলগুলো “ঐতিহাসিক”, তখন ধরে নিতে হয় তিনি মাওয়ের সেই বক্তব্যের কথাই বলছেন, যেখানে মাও বলেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণতান্ত্রিক দলগুলো “সবই ইতিহাসের সৃষ্টি”। এটা খুবই সাধারণ একটি সত্য। যেমন সত্য এটাও যে একদিন কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণতান্ত্রিক দল দুটোরই অবসান হবে। কিন্তু মাও কোথাও বলেননি যে গণতান্ত্রিক দলগুলো কমিউনিস্ট পার্টির অস্তিত্ব যতদিন থাকবে, ততদিন থাকবে, অর্থাৎ কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা হওয়া পর্যন্ত তারা পাশাপাশি টিকে থাকবে।

কমিউনিস্ট পার্টি ও গণতান্ত্রিক দলগুলোর “দীর্ঘমেয়াদি সহাবস্থান ও পারস্পরিক তদারকি”র নীতি চীনা বিপ্লবের বাস্তব পরিস্থিতি থেকেই এসেছিল। চীনা বিপ্লব যেহেতু দীর্ঘ একটি গণতান্ত্রিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এগিয়েছিল, তাই যেসব বুর্জোয়া দল কোনো না কোনোভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরোধিতা করেছিল এবং কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে কাজ করতে রাজি ছিল, তাদের নতুন রাষ্ট্রে কিছুটা ভূমিকা দেওয়াটা স্বাভাবিক এবং সঠিক ছিল। বিষয়টা শুধু ওই দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে ঐক্য করার ছিল না। আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাদের প্রভাবে থাকা সাধারণ মানুষের একটা অংশের সঙ্গে ঐক্য করা, তাদের নিজেদের পক্ষে আনা এবং ধীরে ধীরে তাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটানো, কারণ জনগণের এই অংশটাও তখন সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল।

 একই সঙ্গে মাও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব এবং সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই কমিউনিস্ট পার্টি ও গণতান্ত্রিক দলগুলোর মধ্যে এই সহযোগিতা বজায় রাখা সম্ভব। হোজা যে দাবি করেছেন, গণতান্ত্রিক দলগুলোর নাকি কমিউনিস্ট পার্টির মতোই একই অধিকার ও ক্ষমতা ছিল, সেটা একেবারেই হাস্যকর। বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়ার “অধিকার” ও “ক্ষমতা” অবশ্যই কমিউনিস্ট পার্টিরই দায়িত্ব ছিল। আর এই নেতৃত্বের ভিত্তিতেই গণতান্ত্রিক দলগুলো কোনো ভূমিকা পালন করার সুযোগ পেয়েছিল।

ডেমোক্রেটিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে মাওয়ের কোনো ভুল ধারণা ছিল না। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এসব দল কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নীতির বিরোধিতা করত এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “তারা বিরোধিতা করে, আবার বিরোধিতাও করে না; অনেক সময় বিরোধিতা থেকে বিরোধিতা না করার দিকেও এগিয়ে যায়।” এইভাবে ধীরে ধীরে বিরোধিতা না করার অবস্থায় পৌঁছানোই দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারত, আর মাও সেই সম্ভাবনাটাই খোলা রাখতে চেয়েছিলেন।

তবে মাও আরেকটি সম্ভাবনার জন্যও প্রস্তুত ছিলেন। ডেমোক্রেটিক দলগুলো যে বিপ্লবের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে, সেই সম্ভাবনাও তিনি মাথায় রেখেছিলেন। “শত ফুল” অভিযান শুরুর সময় ১৯৫৭ সালেই তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন:

কমিউনিস্ট পার্টির ইচ্ছা এবং নীতিই হলো আগামী দীর্ঘ সময় ধরে ডেমোক্রেটিক দলগুলোর সঙ্গে পাশাপাশি থাকা। কিন্তু এই ডেমোক্রেটিক দলগুলো দীর্ঘদিন টিকে থাকবে কি না, তা শুধু কমিউনিস্ট পার্টির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। তারা নিজেদের কাজ কতটা ভালোভাবে করছে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারছে কি না, তার ওপরও তা নির্ভর করে।

 এখানে মাও খুব পরিষ্কার করে দিয়েছেন, বুর্জোয়া দলগুলোর বিলুপ্তি বা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার জন্য কী ধরনের “ঐতিহাসিক পরিস্থিতি” দরকার, আর সেটা কমিউনিস্ট পার্টির বিলুপ্তির শর্তের মতো নয়। “তারা নিজেদের কাজ কতটা ভালোভাবে করছে” বলতে মূলত বোঝানো হয়েছে, তারা সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরকে মেনে নিয়ে সেই পথে চলতে রাজি আছে কি না। আর “জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারছে কি না” বলতে বোঝানো হয়েছে, শ্রমিক ও কৃষকদের প্রতি তাদের অবস্থান কী এবং এখনও তাদের পেছনে এমন কোনো সামাজিক ভিত্তি আছে কি না, যাদের সঙ্গে ঐক্য করা এবং যাদের নিজেদের পক্ষে আনা দরকার।

আসলে, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ডেমোক্রেটিক দলগুলো কার্যত তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণের যে কাঠামো ছিল, সেই Political Consultative Conference-ও শেষ পর্যন্ত শুধু নামেই টিকে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। এর কোনো বাস্তব ক্ষমতা ছিল না এবং সাধারণত এর কোনো বৈঠকও হতো না। মাও এবং তাঁর বিপ্লবী নেতৃত্বের সঙ্গে থাকা নেতাদের দৃষ্টিতে বিষয়টা পরিষ্কার ছিল: যে ঐতিহাসিক পরিস্থিতির কারণে ডেমোক্রেটিক দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা প্রয়োজন হয়েছিল, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় সেই পরিস্থিতি আর ছিল না। (সম্ভবত তাইওয়ানের ক্ষেত্রে সীমিত কিছু পরিস্থিতি ছাড়া।)

একটা বিষয় এখানে মনে রাখা দরকার। হোজা এমনভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যেন একাধিক পার্টির অস্তিত্বই লেনিনবাদের সঙ্গে মেলে না। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে এর উল্টো উদাহরণ রয়েছে। যেমন, অক্টোবর বিপ্লব শুধু বলশেভিক পার্টির উদ্যোগেই হয়নি। অবশ্যই বলশেভিক পার্টিই ছিল বিপ্লবের প্রধান নেতৃত্ব ও চালিকাশক্তি, কিন্তু বাম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীরাও এতে অংশ নিয়েছিল। লেনিন প্রস্তাব করেছিলেন, এই পার্টির প্রতিনিধিদের নতুন সরকার, অর্থাৎ Council of People’s Commissars-এ রাখা হোক। তিনি এই সহযোগিতার ভিত্তিটাও ব্যাখ্যা করেছিলেন। লেনিন দেখিয়েছিলেন, কৃষকদের মধ্যে বাম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল এবং তারা কিছুটা সেই কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব করত, যারা বিপ্লবে যোগ দিতে প্রস্তুত ছিল। তাই ক্ষমতা দখলের সময় এবং তার পরেও তাদের সঙ্গে ঐক্য করা দরকার বলে লেনিন মনে করেছিলেন। তবে বলশেভিকদের সঙ্গে বাম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের এই সহযোগিতা বেশিদিন টেকেনি। এর কারণ লেনিন বা বলশেভিক পার্টি জোট ভেঙে দিতে চেয়েছিল, তা নয়। বরং বাম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীরাই নতুন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, বিশেষ করে Brest-Litovsk চুক্তির বিরোধিতা করে। এই পরিস্থিতিতে বলশেভিক পার্টি তাদের বিরুদ্ধে জোরালো আক্রমণ চালায় এবং যারা সর্বহারা শ্রেণি ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, তারা সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের দমননীতির মুখে পড়ে। এই পার্টির সদস্যদের একটা বড় অংশ কেন সর্বহারা শ্রেণি ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চলে গেল, তার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বিপ্লব তখন আত্মরক্ষার অবস্থায় ছিল এবং সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আক্রমণের মুখে পড়েছিল। পরিস্থিতি যদি অন্যরকম হতো, তাহলে লেনিনের লেখায় এমন কোনো কথা নেই যা থেকে বলা যায় যে বাম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের সঙ্গে আরও দীর্ঘ সময় ধরে সহযোগিতা করা সম্ভব ছিল না।

লেনিন এমনকি বলেছিলেন, “বুর্জোয়াদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের জন্য অপরিহার্য বা আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য নয়।” পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতার আলোকে এখন বলা যায়, লেনিনের এই বক্তব্যটি ঠিক ছিল না (অন্তত যদি সমাজতন্ত্রের পুরো সময়কালকে ধরে কথাটি বলা হয়)। কিন্তু এই বক্তব্যের কারণে লেনিনকে একজন সাধারণ উদারপন্থী বলে দাগিয়ে দেওয়া আরও বেশি ভুল, বরং তা হবে সরাসরি প্রতিবিপ্লবী অপবাদ। মূল কথা হলো, সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বকে প্রতিষ্ঠা করা এবং তার নীতি মেনে চলা কমিউনিস্টদের জন্য একটি মৌলিক নীতি। কিন্তু সেই নীতি বাস্তবে কার্যকর করতে গিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে হতে পারে, এবং বাস্তবেও তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রয়োজন হবে। কোনো পরিস্থিতিতে কৌশল বেছে নিতে বা প্রয়োগ করতে ভুল হলেও, সেই ভুলকে হোজার মতো অভিযোগ তোলার ভিত্তি বানানো যায় না। বিশেষ করে এখানে মাও কৌশলগত কোনো ভুল করেছিলেন, এমন দাবির পক্ষে হোজা আদৌ কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি।

আর যেহেতু আমরা “বিপ্লব এবং সমাজতন্ত্র গড়ার কাজে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টির নেতৃত্ব ও তার অবিভাজ্য ভূমিকা” নিয়ে কথা বলছি, তাই আরেকটা বিষয়ও মনে রাখা দরকার। আলবেনীয় পার্টির সরকারি ইতিহাসেই স্বীকার করা হয়েছে যে, দেশ মুক্ত হওয়ার পরও বেশ কয়েক বছর ধরে পার্টি “ক্ষমতায় থাকা প্রধান পার্টি হয়ে যাওয়ার পরও এক ধরনের আধা-গোপন অবস্থায় ছিল... পার্টির কর্মসূচিকে Democratic Front-এর কর্মসূচির আড়ালে রাখা হতো... পার্টির সদস্যরা নিজেদের সদস্যপদ গোপন রাখতেন... এবং CPA-র (তৎকালীন Communist Party of Albania) নির্দেশনাগুলোও Democratic Front-এর সিদ্ধান্ত হিসেবেই প্রকাশ করা হতো।” আলবেনীয় পার্টি নিজেই যে আত্মসমালোচনা করেছে, তার প্রসঙ্গেই এই নীতিগুলোর কথা বলা হয়েছে। আর এগুলো “ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে সবকিছু” ধরনের লাইনে বেশ স্পষ্ট কিছু ভুলের উদাহরণও দেখায়।

অন্যদিকে, মাও যখন ডেমোক্রেটিক দলগুলোর অস্তিত্ব বজায় রাখতে দিচ্ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে সহযোগিতায় উৎসাহ দিচ্ছিলেন, তখনও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে বিপ্লবের পরিস্থিতি বদলে গেলে, যেমন সাম্রাজ্যবাদীরা যদি বড় আকারে বিপ্লবের ওপর আক্রমণ চালায়, তাহলে এই ডেমোক্রেটিক দলগুলোও বিপ্লবের বিরুদ্ধে হিংস্রভাবে চলে যেতে পারে। তিনি ব্যঙ্গ করে সতর্ক করেছিলেন, “ধরো, যদি পারমাণবিক বোমায় পেইচিং আর সাংহাই উড়িয়ে দেওয়ার মতো কিছু ঘটে, তাহলে কি এরা বদলে যাবে না? তারা বদলাবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না... এদের অনেকেই এখনও চুপচাপ পরিস্থিতি দেখছে।”

শেষে এই প্রসঙ্গে চীনের গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে যাওয়ার সময় রাষ্ট্রের চরিত্র বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্নে আবার একটু বিস্তারিতভাবে আসা দরকার। প্রশ্নটি হলো “জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব”। মাও যখন প্রথম এই স্লোগানটি সামনে আনেন, তখন চীনা বিপ্লব এখনও তার প্রথম, অর্থাৎ গণতান্ত্রিক পর্যায়ে ছিল। এই স্লোগানের অর্থ ছিল চারটি শ্রেণির যৌথ একনায়কত্ব: শ্রমিক শ্রেণি, কৃষক, শহুরে ক্ষুদে বুর্জোয়া এবং জাতীয় বুর্জোয়া। সেই সময় এই চারটি শ্রেণিরই কমবেশি বাস্তব স্বার্থ ছিল গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সম্পূর্ণ করার মধ্যে। তার ওপর চীনা বিপ্লবের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘদিনের যুদ্ধ এবং মুক্তাঞ্চলগুলোর অস্তিত্ব। এর ফলে বাস্তবে দুটি রাষ্ট্রব্যবস্থা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। যেমন, তৃতীয় বিপ্লবী গৃহযুদ্ধের সময়, অর্থাৎ চিয়াং কাই শেকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের সময়, কমিউনিস্টদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মুক্তাঞ্চলগুলোতে প্রায় ১০ কোটি মানুষ ছিল এবং সেগুলো কুওমিনতাং-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের মুখোমুখি ছিল। স্বাভাবিকভাবেই, এই মুক্তাঞ্চলগুলোর অস্তিত্বের কারণে সরকারের সামনে কয়েকটি জরুরি কাজ ছিল: প্রতিবিপ্লবীদের দমন করা, ভূমি সংস্কার চালানো, পিপলস লিবারেশন আর্মির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা, অর্থনীতিকে সচল রাখা ইত্যাদি। এই গৃহযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চলগুলোতেই মাওয়ের “জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব” নীতি কার্যকর করা হয়েছিল। চারটি শ্রেণির রাজনৈতিক দল, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং অন্যান্য প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রক্ষমতার বিভিন্ন সংস্থায় প্রতিনিধিত্ব করতেন। বিপ্লবের সেই পর্যায়ের কাজগুলো কী ছিল, তা দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে তখন এই নীতিই ছিল সঠিক।

১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময়ও মূলত একই শ্রেণিশক্তিগুলো এর সঙ্গে ছিল। অর্থাৎ, যারা সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তারাই এই নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল। একই সময়ে, এই নতুন সরকার স্পষ্টভাবেই শ্রমিক শ্রেণি ও তার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এবং শ্রমিক-কৃষক ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। আর তার সামনে ছিল সঙ্গে সঙ্গেই সমাজতন্ত্রের দিকে রূপান্তর শুরু করার কাজ। ফলে শুরু থেকেই “জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের” মধ্যে দুটি পরস্পরবিরোধী দিক ছিল। একদিকে, এটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়কে প্রতিনিধিত্ব করত এবং সেই কারণে জাতীয় বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিরাও এর মধ্যে ছিল। অন্যদিকে, এটি ছিল এমন একটি সরকার, যার নেতৃত্বে ছিল শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা এবং যারা বিপ্লবকে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া শ্রেণির বিলোপ ঘটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।

পরে সেদিকে ফিরে তাকালে বিষয়টা বেশ পরিষ্কার হয়ে যায় যে, দ্বিতীয় দিকটিই আসল ছিল। অর্থাৎ, নতুন রাষ্ট্র যে সমাজতান্ত্রিক পথে এগোচ্ছিল, সেটাই তার সমাজতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণ করেছিল। ১৯৫৬ সালের মধ্যে মাও চীনা রাষ্ট্রকে কখনও “সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব”, আবার কখনও “জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব” বলে উল্লেখ করছিলেন এবং দুটো শব্দই একই অর্থে ব্যবহার করছিলেন। পরবর্তী সময়ের চীনা লেখালেখিতেও ১৯৪৯ সালেই সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, দেশজুড়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের সঙ্গেই সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

তাই এখন পিছন ফিরে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায়, ১৯৪৯ সালে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেটি ছিল সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বেরই একটি রূপ। তবে এই রূপটি চীনের সমাজের চরিত্র এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া ঐতিহাসিক পরিস্থিতিকে মাথায় রেখেই গড়ে উঠেছিল।

লেনিন রাশিয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, যা এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে। তিনি দেখিয়েছিলেন, রাশিয়ার পরিস্থিতিতে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব ছিল একটি বিশেষ ধরনের শ্রেণি-জোট। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এটি ছিল শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে দরিদ্র কৃষকদের জোট, যারা একসঙ্গে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিয়ে গঠিত ছিল। তাই চীনে সর্বহারা শ্রেণির শাসন, অর্থাৎ তার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যে ধরনের শ্রেণি-জোট দরকার হয়েছিল, তা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো হবে না, এটাই স্বাভাবিক। দুই দেশের বস্তুগত পরিস্থিতি, শ্রেণিগঠন এবং বিপ্লবের ক্ষমতায় আসার পথ ছিল আলাদা। একই সঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে এই জোট কোনো স্থির বিষয় ছিল না। বিপ্লব যখন ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পরিণত হচ্ছিল, তখন এই জোটের চরিত্রও বদলাতে থাকত। তাই ১৯৫৩ সালে মাও বলেছিলেন, “জাতীয় বুর্জোয়াদের আর মধ্যবর্তী শ্রেণি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।”

আরেকটা বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মাও যখন এই বিষয় নিয়ে তাঁর প্রধান তাত্ত্বিক লেখাগুলো লিখেছিলেন, তখন এমন কোনো ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ছিল না যেখানে সর্বহারা শ্রেণি ও তার কমিউনিস্ট পার্টি একটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সেই বিজয়ের ভিত্তিতে একটি নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। পূর্ব ইউরোপে ফ্যাসিবাদীদের পরাজয়ের পর যে People’s Democracies গড়ে উঠেছিল (আলবেনিয়াও যার মধ্যে ছিল), সেগুলোর অভিজ্ঞতা অবশ্য ছিল। সেই সময়ের কমিউনিস্ট লেখালেখিতে এগুলোকেও সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব থেকে আলাদা করে দেখা হতো। (এবং মজার বিষয় হলো, সেসব সরকারের মধ্যেও প্রায়ই একাধিক পার্টি ছিল।) কিন্তু নানা কারণে সেই অভিজ্ঞতাকে মাও তখন তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করে সারসংক্ষেপ করতে পারেননি। যাই হোক, ওই পরিস্থিতিগুলো চীনের পরিস্থিতি থেকেও অনেকটাই আলাদা ছিল। ফলে মাও আসলে একেবারে নতুন একটি ঐতিহাসিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি সেই পরিস্থিতি বেশ সঠিকভাবেই মোকাবিলা করেছিলেন এবং এর মধ্য দিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের তত্ত্বে নতুন অবদান রেখেছিলেন।

বিশেষ করে ১৯৫৬ সালে মালিকানার ক্ষেত্রে মৌলিক সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন হওয়ার পরেও চীনের রাষ্ট্রব্যবস্থা সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব ছাড়া অন্য কিছু ছিল, এমন দাবি এনভার হোজার করা চূড়ান্ত ভণ্ডামি। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় থেকে ১৯৭৬ সালের অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রকাশিত সমস্ত লেখালেখিতেই পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, মাও এবং তাঁর পাশে থাকা বিপ্লবীদের রাজনৈতিক লাইন ছিল সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বুর্জোয়া শ্রেণির ওপর সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা। শুধু তাই নয়, চীনা বিপ্লবের পুরো অভিজ্ঞতাই দেখিয়েছে যে মাও চীনের সর্বহারা শ্রেণি ও জনগণকে নিয়ে বুর্জোয়াদের কঠোরভাবে দমন করার সংগ্রাম চালিয়েছিলেন। এর মধ্যে যেমন ছিল পুরনো শোষকরা, যারা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার স্বপ্ন দেখত, তেমনই সমাজতান্ত্রিক সমাজের ভেতর থেকেই তৈরি হওয়া নতুন বুর্জোয়া উপাদানও ছিল। অথচ হোজার যুক্তি শেষ পর্যন্ত ট্রটস্কিবাদীদের সেই পুরনো এবং অবিশ্বাস্য রকম দুর্বল প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিতে এসে ঠেকে: চীনের রাষ্ট্র যদি সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বই হয়ে থাকে, তাহলে People’s Republic-এর পতাকায় এতগুলো তারা কেন?

প্রথমত, এনভার হোজা এমন জায়গাতেই থাকতে চান, যেটাকে তিনি নিজের জন্য নিরাপদ ও শক্ত জমি মনে করেন। কারণ সমাজতন্ত্রের অধীনে বিভিন্ন শ্রেণি ও তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করা তাঁর শক্তির জায়গা নয়। তাই যান্ত্রিক ও গোঁড়া চিন্তাভাবনার ওপর ভরসা করে, তার সঙ্গে ইতিহাসকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়ে, তিনি আশা করেন যে সরলমনা পাঠককে তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্তের দিকে টেনে নেওয়া যাবে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হোজা ইচ্ছা করেই আলোচনাকে আসল প্রশ্ন থেকে সরিয়ে দিতে চাইছেন। সেই প্রশ্ন হলো, সমাজতান্ত্রিক সমাজের ভেতর থেকেই জন্ম নেওয়া নতুন বুর্জোয়া শ্রেণি যাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে পুঁজিবাদ ফিরিয়ে আনতে না পারে, তা কীভাবে ঠেকানো যায়। কারণ এই প্রশ্নেই মাও সে তুং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের তত্ত্ব ও প্রয়োগে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অসাধারণ অবদান রেখেছিলেন। হোজা মাওয়ের এই রাজনৈতিক লাইনকে সরাসরি মোকাবিলা করতে চান না, এবং আসলে তা করতে পারেনও না। তিনি জানেন, এই প্রশ্নে সরাসরি নামলে মার্কসবাদ সম্পর্কে স্টালিনের ভুলগুলোকে শেষ কথা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তার ওপর, এই প্রশ্নগুলোতে আলবেনীয় পার্টির নিজেদের যে অসংলগ্ন ও জটিল অবস্থান রয়েছে, সেটাও তিনি নিশ্চয়ই প্রকাশ্যে আনতে চান না। তাই তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং তার পেছনে থাকা রাজনৈতিক লাইনের প্রশ্ন থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে চীনের পুরনো শোষক শ্রেণির দিকে নিয়ে যেতে চান। অথচ বাস্তবে চীনে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই পুরনো শোষকদের ভূমিকা ছিল গৌণ। হোজা যখন এই ভিত্তিতে আলোচনা চালাতে চাইছেন, তখন তিনি আসলে বর্তমান চীনা সংশোধনবাদী শাসকদের সঙ্গেই একই জায়গায় দাঁড়াচ্ছেন। তারাও প্রমাণ করতে মরিয়া ছিল যে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিপদ তাদের নিজেদের কাছ থেকে নয়, অন্য যেকোনো জায়গা থেকে এসেছে। এখন তাদের অভ্যুত্থান সফল হয়েছে এবং নিজেদের মার্কসবাদী মুখোশটুকুও প্রতিদিন একটু একটু করে খুলে ফেলছে। আর সেই কারণেই হুয়া ও তেং পুরনো সমাজের প্রায় সব রকম অবশিষ্ট শোষক ও প্রতিক্রিয়াশীলদের ফিরিয়ে এনে তাদের প্রশংসায় মেতেছে।


No comments

If you have any doubt, pls let me know